সংগ্রামী নারী খালেদা খাতুন: অপমান-অত্যাচার পেরিয়ে স্বাবলম্বী উদ্যোক্তা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের মোসা. খালেদা খাতুন, এক সংগ্রামী নারীর নাম। জীবনের নানা বাধা-বিপত্তি, অপমান, শারীরিক নির্যাতন আর অবহেলা পেরিয়ে আজ তিনি স্বাবলম্বী উদ্যোক্তা। তাঁর গল্প শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়, বরং অসংখ্য নারীর জন্য প্রেরণার এক আলোকবর্তিকা।

বিয়ের পর দুঃখ-দুর্দশার শুরু:

২০১০ সালে খালেদা খাতুনের বিয়ে হয় একজন সেনা সদস্যের সঙ্গে। কিন্তু বিয়ের পরই জানতে পারেন স্বামী অন্য এক নারীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িত। এরপর শুরু হয় অবহেলা ও নির্যাতনের ভয়াবহ অধ্যায়। নানা অজুহাতে টাকা চাওয়া, মোবাইলে অপমানজনক ছবি ও ভিডিও পাঠানো, অকথ্য ভাষায় গালাগালি এবং শারীরিক নির্যাতন ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এমনকি শাশুড়ি সবকিছু সামনে দেখেও কোনোদিন ছেলেকে থামানোর চেষ্টা করেননি।

একা লড়াইয়ে টিকে থাকা:

বছরের পর বছর অপমান সহ্য করতে করতে এক সময়ও তাঁর জীবনে কিছুটা শান্তি আসে ছেলে সন্তানের জন্মের পর। কিন্তু সেই শান্তি বেশিদিন টেকেনি। স্বামী বিদেশ মিশনে গেলেও আবারো অবহেলা ও দূরত্ব তৈরি হয়। ২০২১ সালে স্বামীর মোবাইলে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও দেখে প্রতিবাদ করলে তিনি স্ত্রী ও সন্তানকে ফেলে পালিয়ে যান। ৯০ দিন পর খালেদা সব গুছিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন একজন অসহায় মা হিসেবে।

হতাশা নয়, পথচলার নতুন শপথ:

হতাশার সময়েও খালেদা খাতুন ভেঙে পড়েননি। তিনি বুঝতে পারেন, এবার তাঁকে বাঁচতে হবে নিজের জন্য নয়, বরং সন্তানের জন্য। ছোটবেলা থেকে হাতের কাজের প্রতি দক্ষতা থাকায় সেটিকেই তিনি পুঁজি করেন। জাতীয় মহিলা সংস্থায় বিজনেস অ্যান্ড ই-কমার্স বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করেন নতুন জীবন। অনলাইনে পেইজ খুলে প্রি-অর্ডারে কাজ শুরু করেন। পরিশ্রম আর ধৈর্যের ফলে ধীরে ধীরে ব্যবসা বড় হতে থাকে।

আজকের সফলতা:

বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠান “বুনন শিল্প” চাঁপাইনবাবগঞ্জেই পরিচালিত হচ্ছে। এখানে ৫০-৬০ জন কর্মী কাজ করছেন। শুধু ব্যবসাই নয়, খালেদা নারীদের হাতের কাজ ও হ্যান্ডপেইন্টিং শেখানোর জন্য একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও গড়ে তুলেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া যায় কুশিকাটার টেবিল রানার, বেডশিট, কুশন কভার, হ্যান্ডপেইন্টিং শাড়ি, পাঞ্জাবি, থ্রিপিস, হাতে তৈরি কেক, মৌসুমী ফল ও পিঠাসহ নানা ধরনের পণ্য।

আয়-রোজগার ও আত্মনির্ভরতা:

খালেদা খাতুনের মাসিক আয় এখন প্রায় ৪০,০০০ টাকা। এই আয়ে তিনি ছেলের সব প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি বাবা-মাকেও সহায়তা করছেন। তাঁর সাফল্যের গল্প প্রমাণ করে—দৃঢ় মনোবল, ধৈর্য ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে একজন নারী জীবনের সব বাধা জয় করে সফল হতে পারেন।

সমাপনী কথা:

খালেদা খাতুনের জীবন কাহিনি কেবল একটি নারীর সংগ্রামের ইতিহাস নয়; বরং সমাজের অন্যান্য নারীদের জন্য এক উজ্জ্বল প্রেরণা। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন—“নারী চাইলে পারে”, শুধু প্রয়োজন সাহস, পরিশ্রম আর সংকল্প

কপিরাইট © বিডি নিউজ লাইভ ৯৯ ডট কম ২০২৬ । সর্বসত্ব সংরক্ষিত।