সাংবাদিক আরবিএস পাভেল চাঁদাবাজ নাকি ষড়যন্ত্রের শিকার? পূর্ণাঙ্গ ঘটনায় উঠছে নানা প্রশ্ন

রাজশাহী প্রতিনিধি

রাজশাহী নগরীতে দায়ের হওয়া একটি চাঁদাবাজি মামলাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক আরবিএস পাভেলকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি।

মামলার অভিযোগ,ঘটনার সময়ক্রম এবং পরবর্তী প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি শুধু একটি সাধারণ অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়-বরং এর পেছনে পরিকল্পিত কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে কিনা,সে প্রশ্নও সামনে আসছে।

মামলার বাদী মো. হাবিবুর রহমান,যিনি মহানগর যুগ্ম দায়রা জজ-২য় আদালতের পেশকার হিসেবে কর্মরত। তার দায়ের করা এজাহার অনুযায়ী,২০২৪ সালের ১০ আগস্ট একটি অজ্ঞাত নম্বর থেকে তাকে মেসেজ দিয়ে জানানো হয়,তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি সংক্রান্ত বিভিন্ন ভিডিও ও অভিযোগ রয়েছে এবং সেগুলো প্রকাশ করা হবে। এর কিছুদিন পর,১৭ আগস্ট রাতে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান গেটের সামনে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে উপস্থিত কিছু ব্যক্তি তার কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহারে আরও বলা হয়,প্রাণনাশের আশঙ্কায় তিনি সেদিন নগদ ২৫ হাজার টাকা প্রদান করেন। এরপর একই ধারাবাহিকতায় ৫ সেপ্টেম্বর আদালত চত্বরে আবারও তার কাছে টাকা দাবি করা হয় এবং তিনি আরও ৩ হাজার টাকা দেন বলে দাবি করেন। সর্বশেষ ২৯ অক্টোবর দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে আদালত কক্ষের ভেতরে পুনরায় তাকে টাকার জন্য চাপ দেওয়া হয় এবং টাকা না দিলে তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করা হয়।

এসব অভিযোগের ভিত্তিতে রাজপাড়া থানায় দণ্ডবিধির ৩৮৫,৩৮৬ ও ৫০৬ ধারায় মামলা নম্বর-২৪ রুজু করা হয়।

তবে এ ঘটনার পর থেকেই সাংবাদিক আরবিএস পাভেলকে ঘিরে নানা প্রশ্ন সামনে আসতে শুরু করে। রাজশাহী নগরীর লক্ষ্মীপুর এলাকার বাসিন্দা পাভেল সাংবাদিকতায় মাস্টার্স ডিগ্রিধারী এবং দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত। পূর্বে তিনি ২০২৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত অনিবন্ধিত বরেন্দ্র প্রেসক্লাব এর তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তিতে ২০২৫ সালের জুন থকে তিনি জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার ২০২৫-২০২৭ মেয়াদের রাজশাহী মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার পেশাগত জীবন ও অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনায় অনেকেই মনে করছেন,এ ধরনের অপরাধে তার সম্পৃক্ততা অস্বাভাবিক এবং প্রশ্নবিদ্ধ।

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো,পাভেল অনিবন্ধিত বরেন্দ্র প্রেসক্লাবে থাকাকালীন সময়ে ক্লাবের বর্তমান সভাপতি,সাধারণ সম্পাদকসহ কয়েকজনের বিভিন্ন অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি অবস্থান নেন বলে জানা যায়। এমনকি মামলার বাদী পেশকারের বক্তব্য নিয়েও তিনি কাজ করেছিলেন,যা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল বলে একাধিক সূত্রে দাবি করা হচ্ছে।

বিশেষ করে ২৯ অক্টোবর আদালত কক্ষে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি নিয়ে ভিন্নমত সামনে এসেছে। জানা যায়,ওই সময় লালন নামের একজন ব্যক্তি পেশকারের কাছে টাকা চাওয়ার অভিযোগে তাৎক্ষণিক ভাবে আদালত কক্ষ থেকেই পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে অভিযোগ উঠেছে,প্রভাব খাটিয়ে প্রকৃত জড়িতদের নাম মামলা থেকে বাদ দেওয়া হলেও কৌশলে আরবিএস পাভেল ও লালনের নাম অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এতে করে প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করে নির্দিষ্ট একজনকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, বরেন্দ্র প্রেসক্লাবের বর্তমান সভাপতি রেজাউল করিমসহ কয়েকজন প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকলেও নিজেদের দায় এড়াতে পাভেলকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে।

বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে যখন কিছু গণমাধ্যমে পাভেলকে সরাসরি “চাঁদাবাজ” হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে,যা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। পাভেলের সঙ্গে পূর্বে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা কিছু ব্যক্তির ছবি ও তথ্য প্রকাশ করে তাকে জড়ানোর চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা,রাজশাহী বিভাগীয় কমিটির পক্ষ থেকে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। তাদের মতে,যদি ঘটনাটি সত্য হয়ে থাকে,তাহলে কেন অন্যান্য সংশ্লিষ্টদের নাম বাদ দেওয়া হলো—তা স্পষ্ট করা জরুরি। আর যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে বাদায় এড়াতে একজন সাংবাদিককে মিথ্যা মামলায় জড়ায়,তাহলে সেটি শুধু নিন্দনীয়ই নয়,বরং আইনের দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে,এই মামলার প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য একটি স্বচ্ছ,নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত এখন সময়ের দাবি। কারণ একজন সাংবাদিক যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে ষড়যন্ত্রের শিকার হন, তাহলে তা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—বরং তা পুরো সাংবাদিক সমাজের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।এদিকে,পাভেল জামিনে মুক্ত হলে ঘটনার আরও বিস্তারিত তথ্য সামনে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন দেখার বিষয়—তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য কতটা দ্রুত উদঘাটিত হয় এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয় কিনা।

কপিরাইট © বিডি নিউজ লাইভ ৯৯ ডট কম ২০২৬ । সর্বসত্ব সংরক্ষিত।