আব্দুল কাদির
>চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ধাইনগর ইউনিয়নে বাল্যবিবাহ ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষকমণ্ডলী, এনজিও প্রতিনিধি, অভিভাবক, ছাত্র-ছাত্রী, যুব প্রতিনিধি ও প্রভাবশালী অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় উপজেলার ধাইনগর ইউনিয়নের লাওঘাটা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ইউনিসেফের অর্থায়নে ও ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের সহযোগিতায় স্ট্রেংদেনিং সোশ্যাল অ্যান্ড বিহেভিয়ার চেঞ্জ (SSBC) প্রকল্পের উদ্যোগে বাল্যবিবাহ বন্ধ ও শিশু সুরক্ষা বিষয়ক এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
জেলা প্রোগ্রাম অফিসার উত্তম মণ্ডলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন লাওঘাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল আলীম। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ধাইনগর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এসএসবিসি প্রকল্প, ওয়ার্ল্ড ভিশন ও ইউনিসেফের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. আজিজুল হক, নিকাহ রেজিস্ট্রার সেতাউর রহমান, উপজেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি আবু সুফিয়ান এবং ধাইনগর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য ফাতিমা বেগম।
এছাড়া স্বাস্থ্যকর্মী (সিএইচসিপি) শওকত আলী, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, হুজুর, অভিভাবক, ছাত্র-ছাত্রী, এনজিও কর্মী ও সংবাদকর্মীসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে আলোচনা কার্যক্রম শুরু হয়। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন এসএসবিসি প্রকল্পের সিএফ মাসুম পারভেজ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। জনসচেতনতাই পারে বাল্যবিবাহ রোধ করতে।
উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় শিবগঞ্জ উপজেলাকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।bsp;তাই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সকল অভিভাবককে সচেতন হতে হবে, যেন একটি শিশুও বাল্যবিবাহের শিকার না হয়। ধাইনগর ইউনিয়নে আগের তুলনায় বাল্যবিবাহ অনেকাংশে কমে গেছে। কেউ বাল্যবিবাহ দিলে বা এতে সহযোগিতা করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যকর্মী (সিএইচসিপি) শওকত আলী বলেন, “বাল্যবিবাহ নারীর শারীরিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে এবং মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে মা ও শিশু অপুষ্টিতে ভুগতে পারে। তাই প্রত্যেক অভিভাবককে সচেতন হতে হবে, যাতে কোনো মেয়েই বাল্যবিবাহের শিকার না হয়।”
বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী মুন্নি বলেন, “আমাদের পরিবার ও সমাজ থেকে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করতে হবে। মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ করে দিয়ে যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে সমাজ গঠনে মেয়েরা পুরুষদের সঙ্গে সমানভাবে ভূমিকা রাখতে পারবে।”
সভাপতির বক্তব্যে আব্দুল আলীম বলেন, “বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক ব্যাধি। এই ব্যাধি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে আমার প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের উপস্থিতির হার আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। সরকারি যেকোনো সহযোগিতা প্রদানের সময় অভিভাবকদের কাছ থেকে ‘বাল্যবিবাহ দেব না’ মর্মে অঙ্গীকারনামা গ্রহণ করা হলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এছাড়া যেসব পরিবারে কোনো বাল্যবিবাহ হয়নি, তাদের উৎসাহিত করতে পুরস্কৃত করা যেতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে আমার বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের উপস্থিতি ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণের হার প্রায় ৯০ শতাংশ। এতে প্রমাণ হয়, অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে এবং বাল্যবিবাহের হার কমেছে।”
নিকাহ রেজিস্ট্রার সেতাউর রহমান বলেন, “চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ হলো অল্প মোহরে বিয়ে, অল্প বয়সে বিয়ে এবং সামান্য পারিবারিক সমস্যায় তালাকের প্রবণতা। তাই সমাজে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। বাল্যবিবাহ বন্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে মা সমাবেশ ও উঠান বৈঠকের আয়োজন করা হলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব।”
