মোঃ জমশেদ আলী
উন্নত জীবনের স্বপ্ন পূরণ করতে ও কর্মসংস্থানের জন্য বর্তমানে ১ কোটিরও বেশি বাংলাদেশি বিদেশে থাকেন। প্রতি বছর দেশে তারা প্রায় ২২-২৩ মিলিয়ন ডলার কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স পাঠান। যার গতিতে এগিয়ে চলছে এই জনবহুল রাষ্ট্রের উন্নয়ন। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ২০০৬ সাল থেকে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতে এবং সম্ভাব্য অভিবাসীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। পাশাপাশি বিদেশে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এমন অভিবাসীদেরকে পরিবারে, সমাজে ও অর্থনৈতিকভাবে পুনরেকত্রীকরণে সহায়তা করছে। বিদেশ-ফেরত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করতে কাজ করছে ব্র্যাকের প্রত্যাশা-২ প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ২০২০ সালের ১ এপ্রিলের পরবর্তী সময়ে বিদেশ-ফেরত অভিবাসীদের জেন্ডার সংবেদনশীল উপায়ে টেকসইভাবে পুনরেকত্রীকরণ নিশ্চিতে মনোসামাজিক কাউন্সেলিং সেবা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনরেকত্রীকরণে সহায়তা করা হচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের যে কোন প্রান্তের মানুষ এই সহায়তা পাবেন। মঙ্গলবার (২৮ মে ২০২৪) ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের উদ্যোগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের আইসিটি ল্যাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ব্র্যাকের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়িত ‘ইমপ্রুভড সাসটেইনেবল রিইন্টিগ্রেশন অব বাংলাদেশি রিটার্নি মাইগ্রেন্টস (প্রত্যাশা-২)’ প্রকল্পের অবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান অতিথি হিসেবে এই সভার উদ্বোধন করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ কে এম গালিভ খাঁন। অনুষ্ঠানে মুল প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেন ব্র্যাক মাইগ্রেশন কর্মসূচির ম্যানেজার মোহাম্মদ হোসেন খান। তিনি বলেন, বিদেশ-ফেরত অভিবাসীরা যেন দেশে আসার পর পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে পারেন এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে পরিবার ও সমাজে অবদান রাখতে পারেন সেই লক্ষ্যে ব্র্যাক কাজ করে যাচ্ছে। একইসাথে সম্ভাব্য অভিবাসীরা যাতে মধ্যসত্বভোগী বা দালাল নির্ভর না হয়ে জেনে বুঝে নিরাপদ ও নিয়মিত পন্থায় বিদেশে যেতে পারেন সে লক্ষ্যে ২০০৬ সাল থেকে ব্র্যাক কাজ করে যাচ্ছে। তিনি আরোও উল্লেখ করেন ইতোমধ্যে ব্র্যাক ২০১৭ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ‘প্রত্যাশা’ প্রকল্পের প্রথম ফেইজের কাজ সফলভাবে বাস্তবায়ন করে বর্তমানে দ্বিতীয় ফেইজে কাজ শুরু করেছে যা মে ২০২৭ সাল পর্যন্ত চলবে। তিনি উল্লেখ করেন, এই প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার জন বিদেশ-ফেরত অভিবাসীকে দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরী সহায়তা প্রদান করা হবে। এছাড়াও ৭ হাজার ৭০০ জন বিদেশ-ফেরত অভিবাসীকে আর্থিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। সভার বিশেষ অতিথির পক্ষে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: নুরুজ্জামান তার বক্তব্যে বলেন, ‘মানুষ না জেনে দালালের প্রলোভনের শিকার হয়ে বিদেশে যাওয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা দেন কিন্তু দেখা গেছে কেউ যেতে পারেন আবার অনেকের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়’। তিনি সকলের উদ্দেশ্য বলেন, বিদেশে যেতে গিয়ে প্রতারণার শিকার যেকোনো ব্যক্তি যদি পুলিশ প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানান তাহলে তাদেরকে সব ধরণের সহযোগিতা প্রদান করা হবে এবং আইনের আওতায় এনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে সম্মানিত জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ কে এম গালিভ খাঁন বিভিন্ন সময় তার করা গবেষণার তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন। একই সাথে তিনি রেমিট্যান্সের সঠিক ব্যবহারের বিষয়ে জোর দেন। তিনি বলেন, প্রবাসীরা টাকা ইনকাম করলেও সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেন না কারণ তাদের পরিবারের লোকজন টাকা অপরিকল্পিতভাবে ব্যয় করেন। যার ফলে পরবর্তীতে রিটার্নী দেশে ফেরত এসে কিছুই করতে পারেন না। যার ফলে অধিকাংশ প্রবাসীই সফল হতে পারেন না। তিনি সকল সরকারি ও বেসরকারী কর্মকর্তাদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি আরোও বলেন ‘যে কোন প্রবাসী প্রতারিত হলে, নিঃস্ব হয়ে ফেরত আসলে তার দায় আমাদের সবার কারণ, আমরা মানুষকে পুরোপুরি সচেতন করতে পারিনি। তাই, আমাদের সকলের দায়িত্ব হলো এই জেলার ৪৫ টি ইউনিয়ন ও প্রত্যেকটি পৌরসভার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক কাজ করা’। সভাপতির বক্তব্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আহমেদ মাহবুব-উল-ইসলাম বলেন, প্রবাসীদের পাশাপাশি তাদের সন্তান ও পরিবারের জন্যও সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা ও শিক্ষা উপবৃত্তি রয়েছে যা সাধারণ মানুষ না জানার কারণে এই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি তার বক্তব্যে সরকারের এই সেবাগুলো বিভিন্নভাবে সব মহলে জানানো এবং প্রচারনা বাড়ানোর প্রতি জোর দেন। তিনি সবশেষে বলেন, ব্র্যাক আজকে যে অবহিতকরণ সভার আয়োজন করেছে এর মাধ্যমে আশা করছি সামনের দিনগুলোতে এই জেলায় প্রবাসীদের নিয়ে কার্যক্রম আরো ত্বরান্বিত হবে এবং অন্যরা একইভাবে এগিয়ে আসবেন। পরিশেষে জেলা প্রশাসক মহোদয় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের পক্ষ থেকে ৩ জন (২ জন নারী ও ১ জন পুরুষ) ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশ ফেরতকে গরু ও ছাগল কেনার জন্য দুই লক্ষ চৌত্রিশ হাজার টাকার চেক হস্তান্তর করেন। অবহিতকরণ সভায় অন্যান্যদের মধ্যে আরোও উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (প্রবাসী কল্যান শাখা), মো: আমিনুল ইসলাম,সহকারী পরিচালক (ডেমো), মো: আখলাক-উজ-জামান, অধ্যক্ষ টিটিসি মো: মঈন উদ্দিন , উপপরিচালক, যুব উন্নয়ন মো: আব্দুল মান্নান, উপপরিচালক-মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, মোসা. সাহিদা আখতার প্রাণিসম্পদ অফিসার, ডা: মো: গোলাম মোস্তফা,জেলা সমবায় অফিসার মো: আকরাম হোসেন-, এ্যাড. ইয়াসমিন সুলতানা রুমা-চেয়ারম্যান, জাতীয় মহিলা সংস্থা, মোহা: আব্দুর রশিদ-জেলা শিক্ষা অফিসার ও মো: শাহজাহান হক-সহকারী পরিচালক, বিআরটিএ প্রমুখ। বিশ্বের সর্ববৃহৎ উন্নয়ন সংস্থা এবং সারাবিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এনজিও- ব্র্যাক, ১৯৭২ সালের প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে দেশে ও দেশের বাইরে নানাবিধ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। ব্র্যাকের বিভিন্ন কর্মসূচিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি কর্মসূচি হল মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম। ব্র্যাকের এই প্রোগ্রাম ২০০৬ সাল থেকে দেশের অভিবাসনপ্রবণ জেলাসমূহে বিদেশগামী নারী ও পুরুষের মাঝে সঠিক তথ্যের মাধ্যমে নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম, বিদেশ-ফেরতদের পুনরেকত্রীকরণ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, অভিবাসন খাতে অ্যাডভোকেসি ও নানাবিধ সহযোগিতামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে আসছে।